২ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে ব্যাকডেটে রায় দিলেন জোনাল অফিসার নাজমুল
ঘুষ না পেয়ে ব্যাকডেটে রায় প্রদান, নোটিশ গোপন, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকদের সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ উঠেছে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ নাজমুল হুদা, নাজির তোফাজ্জল হোসেন ও পেশকার মোঃ শামীম হোসেন।
এ ঘটনায় কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা লুৎফর রহমান গত ৬ মে মহাপরিচালক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটির ডকেট নম্বর ০৬০০৭। একই ধরনের অভিযোগ ৭ মে দায়ের করেন ইনছার আলী নামে এক গ্রাম পুলিশ সদস্য। উভয়ের জমি চর-ভূরুঙ্গামারী মৌজার জে.এল নং-৫০ এলাকায় অবস্থিত।
অভিযোগে বলা হয়, ৯৩/২৩ নম্বর মিসকেসে বিবাদীপক্ষ ১৯৭০ সালের একটি কথিত আমোক্তানামা দলিল উপস্থাপন করলেও বাদীপক্ষ দাবি করেছে, তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৬৩ ও ১৯৬৪ সালের বৈধ দলিলের মাধ্যমে মোট ২ দশমিক ৫০ একর জমি ক্রয় করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ওই জমি সাব-কবলা দলিলমূলে ক্রয় করেন লুৎফর রহমান গং। পরে নামজারি, খাজনা পরিশোধ ও রেকর্ড সংশোধনসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের নামে ডি.আর.এ রেকর্ড ও ডি.পি খতিয়ান প্রস্তুত হয়।
অপরদিকে, ৩১ ধারার শুনানিকালে ২০২০ সালে ভূরুঙ্গামারী সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসে উভয় পক্ষ হাজির হয়ে কাগজপত্র দাখিল করলেও অভিযোগ রয়েছে, সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ লতিফুর রহমান ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২০২১ সালের ৭ মার্চ লুৎফর রহমানকে গরহাজির দেখিয়ে তার রেকর্ডীয় ১ দশমিক ৬২ একর জমি থেকে ১ দশমিক ৪২ একর কর্তন করে বিবাদীপক্ষের অনুকূলে রায় দেওয়া হয়।
এরপর প্রতিকার চেয়ে লুৎফর রহমান ৪২(ক) ধারায় রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে আবেদন করেন। মামলাটি পরে ৯৩/২৩ নম্বর মিসকেস হিসেবে নথিভুক্ত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল উভয় পক্ষের শুনানি শেষে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার নাজমুল হুদা জানান, বিবাদীপক্ষের ১৮৭৩৮/৭০ নম্বর আমোক্তানামা দলিলের সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। পরে এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে মতামতও চাওয়া হয়। জেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে জানায়, দলিলের উৎস স্পষ্ট না হওয়ায় এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এরপরও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে পুনরায় চিঠি দিয়ে দলিলের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।
তবে অভিযোগকারী দাবি করেন, এসব অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় গোপনে আগের তারিখ ব্যবহার করে রায় প্রস্তুত করা হয়। তিনি জানান, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে অফিসে যোগাযোগ করলে পেশকার শামীম হোসেন প্রথমে প্রতিবেদন না আসার কথা বললেও পরে জানতে পারেন, তার বিপক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে।
লুৎফর রহমানের অভিযোগ, স্থানীয় এক ব্যক্তি তাকে আগেই জানিয়েছিলেন— দুই লাখ টাকা ঘুষ না দিলে তার পক্ষে রায় হবে না। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল রায়ের কপি হাতে পেয়ে তিনি দেখতে পান, আদেশে রায়ের তারিখ দেখানো হয়েছে ৮ এপ্রিল ২০২৫। অথচ ওই রায়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে জোনাল অফিস থেকেই ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এতে ব্যাকডেটে রায় প্রদানের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
লুৎফর রহমান বলেন, “আমার সি.এস, এস.এ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব বৈধ দলিল, নামজারি ও খাজনার কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আমাকে জমি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দুই লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রায় নিয়ে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার নাজমুল হুদার সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, “রায়ে অসন্তুষ্ট হলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে যান।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপর এক পৃথক অভিযোগে ইনছার আলীও দাবি করেছেন, “যথাযথ নোটিশ না দিয়ে তার জমি সংক্রান্ত মামলার নথিজাত ও আদেশ দেওয়া হয়েছে”।
অভিযোগকারীরা মহাপরিচালকের কাছে মিসকেস নং-৯৩/২৩ ও সংশ্লিষ্ট আপিল কেসের রায় বাতিল, ডি.পি খতিয়ান বহাল এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোঃ নাজমুল হুদা প্রথমে বলেন যে, তিনি সাংবাদিক বান্ধব মানুষ, বিষয়টি জানার পর তিনি তা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলেছেন এবং এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তিনি সাংবাদিককেও আমন্ত্রণ জানান। আর্থিক অনিয়ম তথা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এ কাজটি করেছেন কিনা এ বিষয়টির উত্তরে তিনি বলেন যে, আমরা তো বেতন পাই, সুতরাং আমার দ্বারা কারো সম্পত্তি কারো কাছে যাক এটা আমার ইচ্ছা নয়। এ সময় তিনি বারবার সংবাদ কর্মীকে আমন্ত্রণ জানান বিষয়টি তার সাথে একত্রে দেখার জন্য। এ সময় তিনি আরো বলেন, কিছু কিছু বিষয় সিভিল মেটার(দেওয়ানী আদালত সংক্রান্ত বিষয়) বা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনাল সংক্রান্ত থাকে, যা সংশ্লিষ্ট সাব রেজিস্ট্রারের কাছে কল করে বা বালাম বই থেকে দলিল চেক করার ক্ষমতা জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের নেই। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আপনি আসেন, আমরা সকলে মিলে একসাথে বিষয়টি খতিয়ে দেখি।