পিরোজপুরে এসএসসি পরীক্ষায় ‘প্রক্সি’ কাণ্ড
পরীক্ষার্থীর হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বড় বোনের পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস নিয়েও তোলপাড়
চলমান এসএসসি পরীক্ষায় নকল, প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতি রোধে সরকার কঠোর অবস্থানের কথা বারবার ঘোষণা দিলেও পিরোজপুরের নাজিরপুরে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর ‘প্রক্সি’ পরীক্ষার অভিযোগ। একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর হয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বড় বোন পরীক্ষা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের হাজী আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে চলমান এসএসসি পরীক্ষায় অদিতি হোসেন (১৭) নামে এক পরীক্ষার্থীর হয়ে তার বড় বোন অনন্যা হোসেন পরীক্ষা দেন। অনন্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বলে জানা গেছে।
গত ২৮ এপ্রিল উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের হাজি আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ৩ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অদিতি হোসেন উপজেলার পলাশডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি পূর্ব বানিয়ারী গ্রামের মো. জাকির হোসেন শেখের মেয়ে। অভিযুক্ত অনন্যা হোসেন তার আপন বড় বোন।
ঘটনার পর স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন পরীক্ষায় জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে, তখন কীভাবে একটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রকাশ্যে প্রক্সি পরীক্ষার মতো ঘটনা ঘটল?
এ ঘটনায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোস্তফা যুবায়ের হয়দার গত ৩ মে কেন্দ্র সচিব ও সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাজী আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক শাহিন হাসান তমাল বলেন, ঘটনার দিন ভাইজোড়া এলাকা থেকে ফোনে বিষয়টি বিদ্যালয়ের এক কর্মচারীকে জানানো হয়। পরে একজন সহকারী শিক্ষক গিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছেন এমন শিক্ষার্থীর পরিচয় যাচাই করে নিশ্চিত হন, তিনি প্রকৃত পরীক্ষার্থী নন। পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানানো হলেও সেটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে শুনেছি।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা দেওয়ার সময় ওই শিক্ষার্থী বোরকা পরা ছিলেন। পরে মুখ খোলার পর প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলে পুরো ঘটনা স্পষ্ট হবে।
বিদ্যালয়সংলগ্ন এক ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুস শেখ বলেন, অভিভাবকদের মাধ্যমে জানতে পারি, একজন পরীক্ষার্থীর হয়ে তার বড় বোন পরীক্ষা দিচ্ছেন। পরে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকেও ঘটনার সত্যতা জানতে পারি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকা হাজী আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক দীনেশচন্দ্র ঘরামী বলেন, আমরা প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেখে পরীক্ষার্থীদের যাচাই করছিলাম। তবে বোরকা পরিহিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরাসরি মুখ খোলার বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় আমরা সতর্ক ছিলাম। পরে অন্য একটি বিদ্যালয় থেকে খবর আসে যে একজন ভুয়া পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন। এরপর আরেক শিক্ষক গিয়ে বিষয়টি যাচাই করেন।
পলাশডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুর রহমান বলেন, অদিতি হোসেন আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সে আগেও পরীক্ষা দিয়েছিল এবং ফল খারাপ হওয়ায় এবার তিন বিষয়ে পুনরায় ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দিচ্ছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না।
এ বিষয়ে হাজী আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া আমি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।
পিরোজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস আলী আযিযী বলেন, বিষয়টি আগে কেউ আমাকে জানায়নি। গণমাধ্যমের মাধ্যমে অবগত হলাম। অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।