কুমিল্লা মুরাদনগরের ঐতিহ্যবাহী সিদল এখন বিদেশমুখী
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের সল্পা গ্রাম একসময় যেটি শুধুই একটি সাধারণ গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন তা পরিচিতি পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী সিদল তৈরির জন্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্প এখন শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে।
ঐতিহ্য ও জীবিকার এক অনন্য সমন্বয়
সল্পা গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই কোনো না কোনোভাবে সিদল তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এটি শুধু একটি পেশা নয়, বরং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এই শিল্পকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে গ্রামের অর্থনীতি। সিদল উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক পরিবার আজ স্বাবলম্বী হয়েছে।
একসময় উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই সিদল তৈরি হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রাপ্যতা কমে যায়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারই এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
কাঁচামালের সংকট, তবুও এগিয়ে চলা
আগে স্থানীয় জলাশয় থেকেই প্রয়োজনীয় মাছ সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু এখন সেই সুযোগ না থাকায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ভোলা অঞ্চল থেকে মাছ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। চলতি বছরে প্রায় ২০ হাজার কেজি মাছ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা থেকে উৎপাদিত হবে প্রায় ৮০০ মণ পুঁটি সিদল।
সিদল তৈরির প্রক্রিয়া
সিদল তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও দক্ষতানির্ভর। পৌষ ও মাঘ মাসে মাটির নিচে গর্ত করে মাটির পাত্র (মটকি) পুঁতে রাখা হয়। এতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মাছ সংরক্ষণ করা হয়। প্রায় তিন মাস পর মটকিগুলো মাটি থেকে তোলা হয় এবং তখনই প্রস্তুত হয় সিদল। প্রতিবছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত এই উৎপাদন কার্যক্রম চলে।
এ বছর প্রায় ৬০০টি মটকি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছে, যা স্থানীয় উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র তুলে ধরে।
বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা
মুরাদনগরের সিদলের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও ফেনীর বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হয় এই সিদল। শুধু দেশেই নয়, ভারতের আগরতলা ও তেলিয়ামুড়া থেকেও পাইকাররা এসে সিদল সংগ্রহ করেন। পরে তা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানো হয়।
এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক উদ্যোগ ও সহায়তা পেলে এই শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
উৎপাদকদের চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় সিদল উৎপাদক সঞ্জিত চন্দ্র সরকার জানান,
“আমরা বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসছি। আগে এলাকায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত, এখন সব কিনে আনতে হয়। বাজারে চাহিদা থাকলেও পুঁজির অভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারছি না।”
অন্যদিকে উত্তম চন্দ্র সরকার বলেন,
সরকার যদি খাল-বিলগুলো পুনরুদ্ধার করে, তাহলে স্থানীয়ভাবে মাছ পাওয়া সহজ হবে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিলে উৎপাদন বাড়িয়ে আমরা আরও বেশি পরিমাণে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।”
সম্ভাবনার দিগন্ত
মুরাদনগরের সিদল শিল্প শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সংযোগ। খাল-বিল পুনরুদ্ধার, সহজ ঋণ সুবিধা এবং রপ্তানির জন্য প্রণোদনা দেওয়া গেলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সল্পা গ্রামের এই ছোট উদ্যোগই একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় মাধ্যম এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।