এক দেশে দুই আইন? মাধবপুরে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় এসএসসি ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাকে ঘিরে সাংবাদিকদের কেন্দ্র প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন দণ্ডবিধির ১৪৪ ধারা জারির দোহাই দিয়ে সাংবাদিকসহ বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহল।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, লিখিত আবেদন করেও পাঁচজন সাংবাদিককে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। সাংবাদিকদের মতে, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও উল্টো সাংবাদিকদের বাইরে রাখা হচ্ছে, যা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাশেম সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দেননি বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকরা। স্থানীয়দের দাবি, স্বাধীনতার পর মাধবপুরে কোনো ইউএনও এমন সিদ্ধান্ত নেননি।
বৃত্তি পরীক্ষাতেও একই অভিযোগ :
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৃত্তি পরীক্ষার সময়ও ১৪৪ ধারা জারির দোহাই দিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কবির হোসেন সাংবাদিকদের জানান, ইউএনওর নির্দেশ রয়েছে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চাইলে লিখিতভাবে আবেদন করে অনুমতি নিতে হবে ইউএনও'র কাছ থেকে।
বৃত্তি পরীক্ষার সময় অনুমতি না পাওয়ার অভিজ্ঞতার পর এবারের এসএসসি পরীক্ষার আগেই পাঁচজন সাংবাদিক লিখিতভাবে অনুমতির আবেদন করেন। তবে সেই আবেদনেও অনুমতি মেলেনি বলে জানা গেছে।
মাধবপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিনিধি কায়েস আহমেদ সালমান বলেন, “এটি শুধু অনুমতি না দেওয়ার বিষয় নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ। এতে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।”
দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি এমএম গউস বলেন, “পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেখানে সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়া হলে এসব অভিযোগ আরও জোরালো হবে।”
মাধবপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের মাধবপুর উপজেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক এম এ কাদের বলেন, সাংবাদিকতার দেড় যুগের অভিজ্ঞতায় তিনি এমন সিদ্ধান্ত আগে দেখেননি, যেমনটি মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাশেম নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘দেখছি’ বা ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’—এমন আশ্বাস পাওয়া গেছে, তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে পুনঃপুন সংবাদ প্রকাশের পরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে উপজেলার সমস্যাগুলো সমাধানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা করেন। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
প্রশাসনের বক্তব্য :
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সাংবাদিকসহ বহিরাগতদের কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকবেন বলেও জানানো হয়।
তবে এ যুক্তি মানতে নারাজ সাংবাদিকরা। তাদের মতে, প্রশাসন ও গণমাধ্যম একে অপরের পরিপূরক।
হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ সেলিম বলেন, “সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে কোনোভাবেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় না। নিয়ম মেনেই তাদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য :
বিষয়টি নিয়ে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, সাংবাদিকদের পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশে কোনো বাধা নেই এবং ১৪৪ ধারা সাংবাদিকদের জন্য নয়। তবে কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পরীক্ষার হলরুমে প্রবেশ করে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যাবে না বলেও তিনি জানান।
এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—দেশের অন্যত্র সাংবাদিকরা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেও মাধবপুরে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? এক দেশে কি দুই ধরনের আইন চলছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এমন প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
নির্বাহী সম্পাদক: মো: মোসাদ্দেক হোসেন বাবুল
প্রকাশক: ইমরান জামান কাজল
www.sawdeshtvnews.com