বিএনপি ক্ষমতায় না গেলে ভাত খাবেন না প্রতিজ্ঞা করা ইনু মিয়াকে ১৭ বছর পর ভাত খাওয়ালেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, এমপি
প্রিয় দলকে ভালোবেসে কত নেতা-কর্মী ও সমর্থক কত কিছুই করেন। বেশিরভাগই রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চান। তবে ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ কৃষক ইনু মিয়ার গল্পটা অন্য ১০ জনের থেকে আলাদা। তার পছন্দের রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রিয় দলটির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে না পেরে তিনি প্রতিবাদস্বরূপ ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাত খান না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভাত খাওয়া শুরু করেন তিনি।
পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম ১৭ বছর ধরে ভাত না খাওয়া ইনু মিয়ার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচর গ্রামে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে নিজ হাতে ভাত খাওয়ায়ে দেন তাকে। নিজ দলের প্রিয় নেতার হাতে প্লেটে ভাত তুলে দেওয়ার পর থেকে হাঁসি মুখে ভাত খাওয়া শুরু করেন ইনু মিয়া। এর আগে তিনি শুধু কলা, রুটি, বিস্কুটসহ শুকনা খাবার খেয়েই কাটিয়েছেন ১৭ বছরেরও বেশি সময়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১২ জানুয়ারি সোমবার উপজেলার রামদী ইউনিয়নের জগৎচর পশ্চিমপাড়ায় স্থানীয় বিএনপির এক কর্মীসভায় নেতাকর্মীরা ভাত-তরকারি এনে ইনু মিয়াকে খেতে অনুরোধ করেন। তবে তা প্রত্যাখ্যান করে ইনু মিয়া বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলেই তবে তিনি ভাত খাবেন। ঐদিন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, এমপি ইনু মিয়াকে কথা দিয়েছিলেন- "বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে ইনু মিয়াকে নিজ হাতে ভাত খাওয়াবেন। তার দেওয়া কথা রাখতে নির্বাচনের পর ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক ভাবে ইনু মিয়ার প্লেটে ভাত তুলে দিয়ে ভাত খাওয়ানো শুরু করান।"
বিএনপির অন্ধভক্ত ইনু মিয়াকে ভাত খাওয়ানোর পর প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি বলেন, ‘যে ব্যক্তি দলকে ভালোবেসে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন আমাদের উচিত তার পাশে থাকা। ভাত না খেয়ে বয়োবৃদ্ধ ইনু মিয়া প্রতীকী প্রতিবাদ করে গেছেন। আমরা দলীয় নেতাকর্মীরা তার যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকবো ইনশাল্লাহ।' তিনি প্রতিশ্রুতি দেন অচিরেই ইনু মিয়াকে একটি নতুন ঘর করে দিবেন এবং একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের হুশিয়ার করে বলেন দলের কোন নেতাকর্মী কোন অন্যায়ের সাথে জড়িত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে মন্ত্রী থানা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি ভৈরব-কুলিয়ারচর থেকে মাদক নির্মুল করতে না পারেন তাহলে আপনারা এসব থানা থেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। আমার দলের কোন নেতা কর্মী যদি মাদকের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তাদেরকেও ছাড় দিবেন না। অন্যায়কারীদের সাথে আমি থাকবোনা। আগে কি হয়েছে না হয়েছে তা আমি জানতে চাইনা। কিন্ত ভৈরব-কুলিয়ারচরকে মাদক মুক্ত করতেই হবে।
এসময় প্রতিমন্ত্রীর সাথে ছিলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এডভোকেট মশিউর রহমান, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. কিতাব আলী, সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. শাহ্ আলম, কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মানবজমিন প্রতিনিধি এডভোকেট মুহাম্মদ শাহ্ আলম (এপিপি), সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফারুকুল ইসলাম ফারুক, রফিকুল ইসলাম আলী, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম মুছা, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন মান্নান, রামদী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মজনু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মো. সাফি উদ্দিন, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহসিন রানা, সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাসুদ আহমেদ ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আজহার উদ্দিন লিটন সহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীবৃন্দ।
ইনু মিয়াকে ভাত খাওয়ানোর আগে ইনু মিয়া প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। প্রতিমন্ত্রীও ইনু মিয়াকে ফুলের মালা পড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান।
জানা যায়, জগৎচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সুলায়মান মিয়ার ছেলে ইনু মিয়া কৃষিশ্রমিক হিসেবে মানুষের জমিতে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেন। তাই এখন আর কাজ করতে পারেন না। শুয়ে-বসে ও ভিক্ষাবৃত্তি করেই দিন কাটছে তার।
ইনু মিয়া তিন সন্তানের জনক। স্ত্রী জোছনা খাতুন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে জাকির হোসেন জুতা তৈরির দোকানে কাজ করেন। মেয়ে মার্জিয়া খাতুনের বিয়ে দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নিবেদিত প্রাণ ইনু মিয়া। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় পশ্চিম জগৎচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন, এদিন আর ভোট দিতে পারেননি তিনি। তারপর প্রতিজ্ঞা করেন, যতদিন না বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, ততদিন তিনি ভাত খাবেন না। এরপর থেকেই ভাত না খেয়ে পার করে দিয়েছেন ১৭ বছরেরও বেশি সময়। পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তিনি ভাত খাননি। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধেও মন গলেনি ইনু মিয়ার। পরিবার ও স্বজনরা নানাভাবে চেষ্টা করেও ভাত খাওয়াতে পারেননি ইনু মিয়াকে। তার একই কথা ছিলো যতদিন না বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, ততদিন তিনি ভাত স্পর্শও করবেন না। মনের আশা পূরণ না হলে কোনোদিনই তিনি ভাত খাবেন না প্রতিজ্ঞা করেন।
কথা হয় ইনু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পছন্দের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলাম। এরপর থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত মরে গেলেও ভাত খাবো না।’ দল ক্ষমতায় এসেছে আমার প্রিয় নেতা শরীফুল আলম ভাই নিজ হাতে আমার প্লেটে ভাত তুলে দিয়েছেন। আমিও ভাত খাওয়া শুরু করে দিয়েছি। তবে আলম ভাই বলেছিলেন, আমাকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। আমারও আশা ছিলো বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। সেই আশা আর পূরণ হলো না। বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই আমাদের প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তবে এখন আমার ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে আমার দুঃখের কথাগুলো বলার।
ইনু মিয়ার স্ত্রী জোছনা খাতুন বলেন, ‘উনাকে অনেক চেষ্টা করেছি ভাত খাওয়ানোর জন্য কিন্তু পারিনি। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে নিয়ে এসেও ভাত খাওয়াতে পারিনি। উনার একটাই কথাছিলো- যতদিন না বিএনপি ক্ষমতায় আসবে ততদিন ভাত খাবেন না। রুটি, পুরি, বিস্কুট, চা এগুলো খেয়ে বেঁচে ছিলেন এত দিন। একমাত্র মেয়ে মার্জিয়া খাতুনের বাড়িতে গিয়েও ভাত খাননি তিনি।’ এতদিন পর তিনি ভাত খেয়েছেন অনেক আনন্দ লাগছে আমার।
রামদী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. আকরাম খান ও সাধারণ সম্পাদক অলি উল্লাহ বলেন, ‘ইনু মিয়া একজন বিএনপিপ্রেমী লোক। উনি বিএনপিকে খুব ভালোবাসেন। ২০০৮ সাল থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর যাবৎ ভাত না খেয়ে ছিলেন। অবশেষে আজ আমাদের প্রিয় নেতা শরীফুল আলম ভাইয়ের মাধ্যমে ভাত খেলেন তিনি।
নির্বাহী সম্পাদক: মো: মোসাদ্দেক হোসেন বাবুল
প্রকাশক: ইমরান জামান কাজল
www.sawdeshtvnews.com